Jahidul Islam Zihad

তৃষ্ণা

আচমকা ঘুম ভেঙে গেলো রফিক সাহেবের। জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলতেছিলো। এর আগে স্বপ্নে কি দেখেছিলো তা ঠিক একটা মনে করতে পারছেন না। তবে কে যেন গলা টিপে ধরছিলো এইটা চোখের সামনে ভেসে আসছে।

গলার নিচে কয়েক বিন্দু ঘাম জড়োসড়ো হয়েছে। টিক টিক শব্দ করে ঘড়ি নিজের সচল বার্তা জানান দিচ্ছে। সময়টা দেখা দরকার। ফোনের পাওয়ার বাটনে কয়েকবার ঠাসা হলো কাজ হলো না। রাগে কয়েকটা চড় থাপ্পড় এতেও না। ফোনের কি দোষ! রফিক সাহেব নিজেই ফোনের আহার দিতে পারে নাই।

অন্ধকার ঘরে দেয়াল ঘেষে বাতির সুইস খুজে ঠাস ঠুস শব্দ করে কয়েকটা সুইস অন করার সাথে সাথে বাতি জ্বালানো হলো। ঘড়ি বলছে, ০২ঃ৩৪।

খুব পিপাসা পেয়েছে টেবিলের উপর জগ ভর্তি পানি রাখা। রফিক সাহেব বাম হাতে কাঁচের গ্লাস নিয়ে ডান হাত দিয়ে জগ থেকে পানি ঢালতে যাবে। আশ্চর্য জগে পানি নেই। অথচ সন্ধ্যার দিকে পুরো এক জগ পানি রাখা ছিলো।

এই পানি না পাওয়ার শোকে রফিক সাহেবের পিপাসা যেনো আরো বেড়ে গেলো। পানির ট্যাপের কাছে গিয়ে ট্যাপ মোড়ানো হলো পানি নেই। আরো কয়েকবার মোড়ানো হলো কোনো কাজ হলো না৷ তবুও রফিক সাহেব থেমে নেই। এক বিন্দু যদি পানি আসতো। তিনি এটাকে স্বর্গীয় পানি ভেবে পান করতেন।

রফিক সাহেব একা ব্যাচেলর থাকেন। পরিবারের সবাই গ্রামে থাকে। সারাদিন অফিস করা শেষে বাসায় এসে একা মনে দিব্যি ঘুমিয়ে থাকে। এজন্য রফিক সাহেবের প্রতিবেশীদের সাথে ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়ে ওঠে নি।

তবে আজ রফিক সাহেব সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি পানি চাইতে প্রতিবেশীদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরবেন। বাসার দরজা খুলে দেখলেন, সদর দরজা তালা দেওয়া। রফিক সাহেব নিচ তলায় থাকে। নিচ তলায় প্রথম সদর দরজা আর দ্বিতীয় তলায় আরেকটি দরজা। সেটাও তালা দেওয়া। যার কারনে বাইরে যাওয়া ও প্রতিবেশীদের কাছে পৌছানোর উপায় রফিক সাহেবের নেই। এখন কি করবেন তিনি বুঝতে পারছেন না। দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা দিতে লাগলো। আজ কি সবাই বদির। কেউ তার আহাজারি শুনে না!

বাইরে ঝুমঝুম করে বৃষ্টি পরছে। তবে এই বৃষ্টি ছোয়ার সাধ্য রফিক সাহেবের নেই। ইশ, কোনো জাদু-মন্ত্র করে হাতটা যদি আরেকটু লম্বা করা যেতো।

পিপাসার মাত্রা বেড়েই যাচ্ছে রফিক সাহেবের। ফোনে চার্জ দেওয়া গেলে মন্দ না। কাউকে যদি তার আহাজারির বার্তা পাঠানো যায়।

যাহ! ফোনটাও চার্জ নিচ্ছে না।

সব ব্যার্থ চেষ্টা করে রফিক সাহেব দেয়ালে হেলিয়া পরলেন। তার চোখ থেকেও পানি ঝরছে না। পৃথিবীতে এক তৃতীয়াংশ পানি। অথচ রফিক সাহেবের জন্য আজ এক বিন্দু পানি নেই। তার শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে বুকের বা পাশের ফুসফুসটা কোনো এক অজানা শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।

হঠাৎ রফিক সাহেবের মস্তিষ্ক কিছু একটা মনে করিয়ে দিলো। রফিক সাহেব এটা মনে করতে চায় না। তারপরও তার মস্তিষ্ক জোর করে তাকে মনে করিয়ে দিতে চাইছে।

কোনো এক সকালে রফিক সাহেব অফিসের দিকে যাচ্ছিলেন। পথে এক ভিক্ষুক তার হাতে পানির বোতল দেখে বলছিলো, ‘বাবা একটু পানি দেন, অনেক পিপাসা পাইছে। পানি না খাইলে মইরাই যামু।’

রফিক সাহেব তাকে অবজ্ঞা করে হেটে যাচ্ছিলেন। তবুও ভিক্ষুক তার পিছু ছাড়লো না। এক ফোঁটা পানির জন্য বারবার তাকে অনুরোধ করছিলো। সেদিন রফিক সাহেবের মনে একটুও মায়া জন্মায় নি।

আজ রফিক সাহেবের পানির জন্য এতো আহাজারি। তবে কি সেদিনের ঘটনার জন্য শিক্ষা নাকি এটাই রফিক সাহেবের জীবনের শেষ রাত!
বাইরে ঝুমঝুম বৃষ্টি পরেই যাচ্ছে।

ছোট গল্প: তৃষ্ণা
লেখক: জাহিদুল ইসলাম জিহাদ
আগস্ট (২০২০)

 

Scroll to Top