সোহাগী
নির্জন জঙ্গল, চারদিকে কোন মানুষ নেই, চাঁদনি রাত, তবে গাছপালার কারনে হালকা আধারের মত লাগছে। শরীরটা প্রচন্ড ব্যাথা করছে। বা পায়ের গোড়ালি মাটির সাথে ভর দিতে পারছি না। কপালের এক কোনা থেকে রক্ত বেয়ে পরছে। আমার শারীরিক শক্তি বলতে গেলে নেই, নিজেকে সামনের দিকে নিয়ে যেতে পারছি না। ইচ্ছে করে এখানেই শুয়ে পরি। তবে মানসিক শক্তি দিয়ে নিজেকে ফিরে যেতে হবে। গাছ থেকে মাঝে মাঝে ছোট ছোট ডাল ভেঙ্গে পরছে, চারদিকে ইঁদুরগুলো ছোটাছুটি করছে। আমার কাছে কেমন জানি মনে হয় ওরা আমার কষ্ট দেখে আনন্দিত হচ্ছে। যাই হোক মাটির সাথে হালকা ভাবে পা ফেলে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। অনেক দূর যাওয়ার পর চোখে পড়ল খানিকটা দূরে কে যেন আগুনের কাছে বসে আছে। তারপর আমি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে তার দিকে যেতে থাকি। আমার উপস্তিতি টের পেয়ে খোলা গলায় শব্দ করে উঠলো কে ওখানে! “আমি বললাম ” আমি মানুষ, আমার একটু সাহায্য এর প্রয়োজন। তারপর লোকটি আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। খেয়াল করে দেখলাম তার যথেষ্ট বয়স হয়েছে, চুল ও দাড়ি হালকা ভাবে পেকে গেছে। চেহারার মাঝে কেমন জানি একটা রাগী ছাপ। মনে হচ্ছে এখনি আমায় গিলে খেয়ে ফেলবে, সেই দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। যাই হোক সাহস নিয়ে তার কাছে বসলাম। বসা মাত্রই রাগী গলায় জিজ্ঞেস করলেন তুমি কে আর এখানে কি চাও? “আমি বললাম” সব পরে বলব আগে আমাকে একটু পানি খেতে দিন। তারপর লোকটি একটু বিরক্তিকর ভাবে নিজের ছোট্ট ঘরের দিকে গেলেন এবং একটি মগে করে পানি নিয়ে আসলেন। তারপর পানির মগটি আমার হাতে দিলেন। আমি পাওয়া মাত্রই ঢক ঢক করে গিলতে লাগলাম। তারপর পানির মগটি তার হাতে দিয়ে জোড়ে জোড়ে নিশ্বাস নিতে লাগলাম। লোকটি আবার জিজ্ঞেস করল কি চাও এখানে? তবে এবার একটু হালকা ভাবে বলল। আমি মুখ খুলে বলতে যাব এমনি সময় সে বলে উঠল থাক পরে বলবে, তোমার উপরে মনে হয় কেউ হামলা করছে, এখন তোমার প্রাথমিক চিকিৎসার প্রয়োজন। এই বলে তিনি আবার নিজের ঘর থেকে একটি পুরানো কাপর নিয়ে আসলেন এবং কাপরটা আগুন থেকে খানিকটা দূরে রাখলেন যেন কাপরটা পর্যাপ্ত গরম হয় এবং পুড়ে না যায়। তারপর কোথায় যেন হেটে চলে গেলেন, কিছুক্ষন পর অনেকগুলো পাতা নিয়ে আসলেন। এরপর পাতাগুলো হাম্বুলদিস্তায় পিশতে লাগলেন। পাতাগুলোর রস আমার ক্ষত স্তানে লাগাতে লাগলেন। সত্যি অনেক পুড়ে যাচ্ছে তবু দাঁতে দাঁত কামরে সহ্য করছি l তার সেবা পেয়ে নিজেকে অনেকটা সুস্থ মনে হচ্ছে। নিজের মধ্যে একটা চিন্তা জেগে উঠলো লোকটি হঠাৎ করে এইরকম পাল্টে গেল কেন! যাই হোক সবার মধ্যে একটু হলেও মনুষ্যত্ববোধ আছে। এই মানুষটি তার বড় উদাহরন। এরই মধ্যে লোকটি তার ঘর থেকে খাবার নিয়ে আসলেন, ভাত সাথে ডিম ও আলু দিয়ে তরকারি। তারপর অনেক নরম গলায় বলল” এখন নিজেকে সুস্থ মনে হচ্ছে বাবা? আমি বললাম হ্যা এখন অনেকটা সুস্থ আছি। তিনি বলল” তা এখন এই খাবারটুকু খেয়ে নাও।
আচ্ছা আপনিও বসেন একসাথে খাই।
আমার ক্ষিদে নেই পরে খেয়ে নিব, তুমি খাও।
আমার হাত ধুয়ে নেওয়ার জন্য পাত্র সামনের দিকে এগিয়ে দিলেন। তারপর আমি খাবার মুখের কাছে নিতে না নিতে একটা সন্ধেহ জেগে উঠলো, খাবারের মধ্যে কোন খারাপ কিছু মিশানো নেই তো! এরই মধ্যে তিনি বলে উঠলো তুমি নিচিন্তে খাবার খেতে পার এর মধ্যে অপ্রয়োজনীয় কোন কিছু মিশানো নেই। তারপর উনি আমার থালা থেকে এক লোকমা খাবার নিজের মুখে দিলেন। কি এবার বিশ্বাস করলে তো? আমি কি বলব বুজতে পারছি না তবে খাবারে কোন কিছু মেশানো নেই তা নিশ্চিত হওয়া গেল। আমি খাবার খেতে লাগলাম এর মধ্যে উনি বলল খাবার কেমন হয়েছে বাবা? আমি বললাম সত্যি অনেক ভালো হইছে। কথাটি ওনাকে খুশি করার উদ্দেশ্যে বলি নাই এমনিতেই খাবারের স্বাদ অনেক সুন্দর হইছে। আমি খাবার খেতে খেতে ওনাকে বললাম আচ্ছা আপনি এখানে থাকেন কেন? উনি মুচকি হাসি দিয়ে বলল” সব পরে বলব আগে খেয়ে নাও। আমার খাওয়া শেষ হওয়ার পর আবার বললাম এবার বলুন আপনি এখানে কিসের জন্য থাকেন? উনি আমার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন আগে বলো তুমি এখানে কিভাবে আসলে?এরপর আমি কিছুক্ষন চুপ থেকে বলতে লাগলাম” আমি আনুমানিক রাত ৮ টার দিকে রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম। হঠাৎ জঙ্গলের মাঝ বরাবর থেকে চিৎকারের আওয়াজ শুনতে পাই। কেউ চিৎকার করে বলছে আমাকে ছেড়ে দাও আমি আপনাদের পায়ে পড়ি। আরো জোড়ে চিৎকার করে বলছে কেউ আছ আমাকে বাঁচাও। তারপর আমি জঙ্গলের দিকে ঢুকে পড়ি। চিৎকারের ধ্বনি শুনতে শুনতে সেই দিকে আগাতে থাকি। একপর্যায়ে সেখানে পৌছে যাই, তারপর আমি যা দেখতে পাই! এই কথা বলতে না বলতে বুকের মধ্যে কম্পনের সৃষ্টি হলো। আমি আর কথা বলতে পারছি না। লোকটি বলল” তারপর কি হইছে? আমি পাশে রাখা জগ থেকে মগের ভিতরে পানি ঢেলে গিলতে লাগলাম। তারপর দীর্ঘ নিশ্বাস নিয়ে বলতে লাগলাম” নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না! ওখানে গিয়ে দেখলাম মাথা বিহীন একজনের লাশ পড়ে রইছে। আর একজনকে চোখ বেধে গাছের সাথে বেধে রাখা হইছে। তিনি প্রচন্ড বেগে চিৎকার করছে। আমি সেখানে পৌছা মাত্র আর একজনকে মারার প্রস্ততি নিচ্ছে তিনিও প্রচন্ড বেগে চিৎকার করছে। আমি কি করব বুজতে পারছি না, ওদেরকে বাধা দিব না নিজেকে লুকিয়ে রাখব। এই কথা ভাবতে না ভাবতেই একজন ওর ঘার বরাবর জোড়ে কোপ দিয়ে শরীর থেকে মাথা আলাদা করে ফেলছে। আমি এই দৃশ্য সহ্য করতে পারি নাই, নিজের অজান্তেই গলা থেকে অপরিচিত শব্দ বেরিয়ে এল। এরই মধ্যে ওদের মধ্য থেকে তিন জন এসে আমাকে ধরে ফেলে। ওরা আমাকে খুব শক্তভাবে ধরে রেখেছে। সত্যি বলতে ওরা যদি আমাকে ধরে না রাখত আমি দৌড়ে পালাতে পারতাম না। কারন নিজের মধ্যে বোধ শক্তি কাজ করছিল না। ওদের মধ্য থেকে একজনে আমাকে বিভিন্নভাবে আঘাত করতে থাকে। তারপর ওরা আমাকে জবাই করা ও চোখ বাধা লোকের দিকে নিয়ে যায়। ওখানে নেয়া মাত্রই একজনে বলতে লাগল তুই এখানে কি করে আসলি? তারপর জবাই করা লোকদুটোর দিকে তাকিয়ে বলল” এদের অবস্থা দেখছো তোর অবস্থা কি এই রকম করব! আমি শুধু তার রক্ত জমাট বাধা চোখের দিকে তাকিয়ে রইছি। আর আতঙ্কিত ঢেকুর তুলছি। কিছুক্ষন পর আবার বলল”তোর তো সাহস কম না! তোর এখানে আসতে একবারও বুক কাপে নাই। তুই একবারও ভাবলি না এখানে ডাকাতরা থাকতে পারে।
দেখুন আমি এসব কিছু ভেবে এখানে আসি নাই। ভাবলাম কেউ বিপদে পরেছে তাকে উদ্ধার করতে হবে। তাছাড়া আপনারা এই ধরনের কাজ কেনই বা করছেন? এরা আপনাদের সাথে কি করেছে যে এদের নির্বিচারে হত্যা করছেন।
এরই মধ্যে চোখ বাধা লোকটি ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগল এবং বলতে লাগল আমাকে ছেড়ে দিন প্লিজ,,,, আমার বা হাত ধরে রাখা লোকটি বলল ও ভীষন কান্না করছে ওকে ঠান্ডা করে দে। তারপর আমার সামনে দাড়ানো লোকটি ওর হাতে থাকা বড় ছুরি দিয়ে ওর মাথাও শরীর থেকে আলাদা করে ফেলল। ওর রক্তের এক বিন্দু আমার শরীরে এসে পরল, তৎক্ষণাত শিউরে উঠলাম। নিজের চোখ বন্ধ করে ফেললাম আর শুধু হতাসভাবে ভাবতে লাগলাম এগুলো দুঃস্বপ্ন হলে ভালো হত কিন্তু এ তো দুঃস্বপ্নের চেয়েও ভয়ংকর। চোখ খুলে দেখলাম লোকটির দেহ জবাই করা মুরগির মত এদিক ওদিক লাফাতে আছে। নিজের চোখ দিয়ে মায়াবি অশ্রু গড়িয়ে পরতে লাগল। মানুষ হয়ে মানুষকে কিভাবে এইরকম ভাবে মারছে। এরই মধ্যে লোকটি আমার দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল তোকেও কি এভাবে মারব না এখান থেকে পালাবি? আমার হাত দুটো ধরে রাখা লোকদের বলতে লাগল ওর হাত ছেড়ে দে ও এখানে ভুল করে এসেছে ও ওদের মত কোন দোষ করে নাই। তারপর ওরা আমাকে ছেড়ে দেয়, সামনে তিনটা গলা কাটা লাশ পরে রইছে। মনে মনে ভাবতে লাগলাম ওরা আবার কি দোষ করেছে যার জন্য এইরকম প্রতিদান দিতে হল। অনেকটা সাহস নিয়ে লোকটির দিকে তাকিয়ে বলতে বললাম” ওরা কি এমন ভুল করেছে যার জন্য আপনারা ওদের নিশংস ভাবে খুন করলেন! আমার কথা শেষ হতে না হতেই পাশের লোকটি বসে থাকা অবস্থায় আমার পায়ে প্রচন্ড বেগে আগাত করে আর বলতে লাগল তোকে মারি নাই তোর ভাগ্য ভালো তারাতারি এখান থেকে পালা। আমি যার কাছে প্রশ্ন করছিলাম তার দিকে উত্তরটি পাওয়ার ভঙ্গিতে তাকাই। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে রাগী কন্ঠে বলতে লাগল এক থেকে দশ পর্যন্ত গুনবো এর মধ্যে এখান থেকে পালাবি নইলে তোর অবস্থা আরো করুন হবে। এই বলে তিন পর্যন্ত গুনে ফেলল। আমি ওখানেই দাড়িয়ে রইলাম। আমার পাশে থাকা আরো একটি লোক কানের কাছে ফিস ফিস করে বলল ভাই চলে যান আপনাকে খুব ভালো মানুষ মনে হচ্ছে আমি আপনার মৃত্যু দেখতে পারব না। ছয় পর্যন্ত গুনে ফেলল তারপরও আমি ওখান থেকে যাচ্ছি না। পাশের লোকটি আমার ডান হাত চেপে ধরে আর আমাকে বলছে ভাই আমি আপনাকে এগিয়ে দিয়ে আসি আপনি যান এই বলে আমার হাত টেনে ধরে ঝড়ের বেগে দৌড় শুরু করল সাথে আমিও দৌড়াচ্ছি। এক পর্যায়ে একটা গাছের সাথে ধাক্কা লেগে কপালের ওপর দিকে ওনেকটা ফেটে যায়। লোকটি বোধ হয় তা খেয়াল করতে পারে নাই। তিনি আমাকে বলছে ভাই এখন আপনি বিপদ মুক্ত এখন আপনি চলে যান আমি আমার আস্তানায় ফিরে যাই। এই বলে আর দেরি না করে সে চলে গেলেন। আমি শুধু তার পথের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। ভাবতে লাগলাম এরা মানুষ মারছে আর এরাই মানুষকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে পরছে। কিছুই বুজে উঠতে পারলাম না।
তারপর অনেক কষ্টে হাটতে হাটতে আপনার এখানে এসে পৌছাই।
আমার কথা শোনার পর তিনি বলল তোমার ভাগ্য তো অনেক ভালো যে তুমি জানে বেঁচে গেলে।
এবার আপনি বলুন আপনি কি কারনে এখানে থাকেন?
আমার কথা শোনার পর লোকটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল” সে অনেক কথা বাবা, আমার জীবনে এইরকম কিছু হবে কল্পনাও করতে পারি নাই।
কি হইছে আপনার জীবনে?
লোকটি বলতে লাগল” আমি তখন এই জঙ্গলের পাশেই শহরে বসবাস করি রিকশা চালিয়ে রোজগার করতাম। আমার ঘরে একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। কিন্তু দূর্ভাগ্যবসত ওকে জন্ম দিয়ে ওর মা পরপারে চলে যায়। এরপর আমাকে অনেকে দ্বিতীয় বিবাহ করতে বলে কিন্তু আমার কন্যা সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে বিবাহ করি নাই। যদি ওর শত মা ওকে আদর সোহাগ থেকে বঞ্চিত করে। কি মায়াবি আমার কন্যা সন্তানের মুখ, জন্মের পরপরই তার মাকে হারিয়ে ফেলছে। তাই আমি ওর নাম রাখি সোহাগী। আমার আত্মীয় বলতে কেউ নেই। তাই শিশুকাল থেকে আমি ওকে বাবা মায়ের উভয়ের আদর সোহাগ দিয়ে বড় করতে থাকি। ওকে স্কুলে ভর্তি করাই, লেখাপড়ায় খুব ভালো প্রত্যেক ক্লাসে ওর রোল নং এক থেকে দুই তে যায় নাই। ও আমার বুক গর্বে ডুবিয়ে রেখেছে। মাঝে মাঝে বাড়িতে এসে অভিমান করে কাঁদত, জিজ্ঞেস করলে বলত বাবা আজ অমুক স্যারে বলেছে আমি রিকশা চালকের মেয়ে হয়ে অনেক ভালো পড়ালেখা পারি আমি যদি ভালো ঘরের মেয়ে হতাম তাহলে নাকি এর থেকেও ভালো পারতাম। আমার মেয়ের কথা শুনে বলতাম স্যার তো ঠিকই বলেছে, আসলেই তুমি এর থেকে ভালো কিছু করতে পারতে।
বাবা সে তোমাকে রিকসা চালক বলবে কেন? তুমি তো আমার বাবা, আমার বড়লোক বাবার দরকার নেই আমি তোমার মতই বাবা চাই। এই কথা বলে জড়িয়ে ধরে কাঁদত। এভাবে আমার মেয়ে ও আমার দিনগুলি চলতে লাগল।একপর্যায়ে সোহাগী দশম শ্রেনীতে ওঠে। ও প্রায় প্রায় আমাকে এসে বলত বাবা পথে অনেকগুলি ছেলেরা আমাকে বাজে কথা বলে। তুমি ওদেরকে কিছু বলো।
আরে কয়দিন আর বলবে ওরা নিজের থেকেই ঠিক হয়ে যাবে।
তারপরও তুমি ওদেরকে গিয়ে কিছু বলো ওরা খুব খারাপ।
বলবো হানে এখন ঘুমিয়ে পরো।
ও হাসি মুখে বলত কিন্তু এখন তো ঘুমাবো না বাবা, ক্লাসের পড়া রেডি করে তারপর ঘুমাবো।
আচ্ছা তারাতারি ঘুমাবে নইলে শরীর খারাপ করবে।
আচ্ছা বাবা।
একদিন সন্ধ্যা বেলা রিকশা নিয়ে বাড়ি ফিরি এবং সোহাগীর জন্য চালতার আচার নিয়ে আসছি ওর খুব পছন্দের। সোহাগী সোহাগী বলে ডাকতে থাকি কিন্তু কোন সাড়া দিচ্ছে না। ভাবলাম ঘুমাচ্ছে যা রাত জাগে। ঘরের সামনে গেলাম কিন্তু ঘর তালা দেওয়া, কিন্তু ওর তো এতক্ষনে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার কথা। পাশের বাসার সেফালি খালার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম সোহাগীকে দেখেছে কিনা। তিনি বলল” ও এখনো আসে নাই বলো কি তা গেল কোথায়! আমি দেরি না করে স্কুলের দিকে ছুটে গেলাম। গিয়ে শুধু স্কুলের কর্মচারিকে পেলাম তাকে জিজ্ঞেস করলাম সোহাগীকে দেখেছে কিনা? সেও বলছে না। আমার পরানটা কেমন জানি ছটফট করতে লাগল। রাস্তায় যারে পাই তারেই বলি সোহাগীকে দেখছো কিনা? অন্যদিকে আমার প্রতিবেশীরা সোহাগীকে খুজতে বেরিয়ে গেল। ও ছিল সবার আদরের পাত্রী ওর এভাবে হারিয়ে যাওয়া কেউ মেনে নিতে পারছে না। আমি ও প্রতিবেশীরা সারা রাত সোহাগীকে খুজে বেড়াই। কিন্তু মেয়েটাকে কোথাও পেলাম না। সকাল হবে হবে আমাকে সবাই জোড় করে বাড়ি নিয়ে আসল। ঘরে ঢোকার পর ঐ চালতা আচারের দিকে চোখ পরে। চিৎকার করে কাঁদতে লাগলাম সোহাগী তুই কই এই দেখ তোর জন্য কি নিয়ে এসেছি। বাবার সাথে লুকচুরি খেলার অভ্যাস তোর এখনো গেল না। সবাই আমাকে শান্তনা দিচ্ছে সোহাগী ফিরে আসবে। এরই মধ্যে ঘরে এক পুলিশ অফিসার আসলো। তিনি এসে বলছে আজ সকালে জঙ্গলের মধ্যে একটা স্কুল পড়ুয়া মেয়ের লাশ পাওয়া গেছে। আপনাদের মধ্য থেকে কেউ যদি আমার সাথে থানায় গিয়ে লাশটা চিহ্নিত করে আসতেন যে লাশটা আপনাদের মেয়ের কিনা! তার মুখে কথাটি শোনা মাত্র বেহুশ হয়ে পড়ি। হুশ ফেরার পর দেখতে পেলাম আমার ঘরে অনেক লোকজন। আমি শোয়া থেকে উঠে ঘরের সামনে থেকে ভেতরে প্রবেশ করলাম। আর দেখতে পেলাম আমার সোহাগী গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে আর পাশে বসে সেফালি খালা কাঁদছে। আমি এইরকম দৃশ্য দেখব কল্পনাও করতে পারি নাই। হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলাম, আমি কি এমন করেছি যার জন্য এইরকম শাস্তি ভোগ করতে হইছে। ওর মৃতদেহ দাফন কাফনের ব্যবস্থা করে থানায় ছুটে গেলাম পুলিশের কাছে। জানতে চাইলাম আমার মেয়ের লাশ জঙ্গলে থাকবে কেন? ওনারা আমাকে যা বলল তা শুনে মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরল। আমার মেয়েকে নাকি কয়েকজনে মিলে দর্শন করছে তারপর গাছের সাথে জুলিয়ে আমার মেয়েকে মেরে ফেলে। পুলিশকে বললাম আমার মেয়ের হত্যাকারিকে খুজে পেয়েছেন?
না তবে আমরা চেষ্টা করছি খুজে বের করার আপনি ভরসা রাখেন পেয়ে যাবো।
এরপর তিন দিন পর খবর পেলাম পুলিশ নাকি আমার মেয়ের খুনিদের আটক করতে পেরেছে। থানায় ছুটে গিয়ে ওদেরকে বলতে লাগলাম আমার সোহাগী তোদের সাথে কি এমন করেছে যে তোরা ওর সাথে এমনটা করতে পারলি। তোদের ঘরে কি মা বোন নেই? আমার কথা শুনে ওদের মধ্য থেকে একজন বলল আপনার মেয়েকে খুব ভালো লাগছে তাই ওর সাথে এইরকম করছি। আর থানা পুলিশ আমাদের কিছু করতে পারবে না। আমরা এখান থেকে ঠিক ছাড়া পাব আর আপনার মেয়ের মত অনেক মেয়ের সাথে এইরকম করব। এই কথা বলে হাহাহাহা করে হাসতে লাগল। আমার মাথায় কোন কাজ করছিল না ইচ্ছা করছে ওদের ওখানেই পুতে ফেলি। তারপর জেলের ফাক দিয়ে ওদের একজনের কলার চেপে ধরি। এরই মধ্যে পুলিশ এসে আমাকে টেনে নিয়ে যায়। কয়েকদিন পর খবর পেলাম ওরা ঠিক ছাড়া পেয়ে গেছে। তৎক্ষনাৎ পুলিশের কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম। পুলিশ বলছে ওদের আটকে রাখার মত আমাদের কোন ক্ষমতা নেই, উপর থেকে ফোন আসে তারপর আমরা ওদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হই। পুলিশের এই কথা শুনে নির্বাক মনে বাড়ি ফিরলাম। তারপর প্রতিজ্ঞা করলাম আমার মেয়ের সাথে যারা এইরকম করছে তাদের কাউকে বাঁচতে দিব না। তারপর থেকে আমি এখানে থাকি। বিভিন্ন মাধ্যমে ওদেরকে এখানে নিয়ে এসে নিমর্মভাবে খুন করেছি। আজ আমি এখানে থাকি প্রায় বিশ বছর হইছে।
আমি ওনার কথা শুনে অবাক নয়নে তাকিয়ে থাকি। উনাকে কি বলব বুঝতে পারছি না। তারপর উনি আবার বলতে লাগল এবার তোমাকে যা শুনাবো তা শুনে তুমি অবাক না হয়ে পারবে না।
কি কথা?
তুমি যাদের খুন করতে দেখেছো ওরা আমার লোক।
আমি ওনার কথা শুনে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকি, ওরা আপনার লোক মানে?
হ্যা ওরা আমার লোক, ওদের মধ্যে কেউ আছে আমার মত দর্শিত মেয়ের বাবা, কেউ আছে ভাই, কেউ আছে প্রেমিক। সবার একটাই উদ্দেশ্য দশর্নকারীদের দুনিয়ায় জায়গা নেই। আর যাদের খুন হতে দেখেছো ওরা কোন না কোন মেয়েকে দর্শন করেছে। যার ফলস্বরূপ ওদের মৃতু্দন্ড ভোগ করতে হইছে।
সংক্ষিপ্তভাবে তিনি আমাকে সব বুঝিয়ে বললেন। কিন্তু আমার কাছে সব এলোমেলো লাগছে। আমি ওনাকে বললাম কিন্তু এর জন্য তো আইন আছে তা আপনারা নিজের হাতে কেন আইন তুলে নিচ্ছেন।
আইন আছে বলেই দর্শনকারীরা একটি মেয়েকে দর্শন করার পর জেলে থাকা অবস্থায় অন্য মেয়েদের দিকে ইশারা করতে পারে।
আমি ওনার কথা শুনে মাথা নিচু দিয়ে নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলাম। কিছুক্ষন পরে লোকটি বলল” অনেক রাত হইছে তুমি তোমার গন্তব্যে ফিরে যাও। ওনার এই ধরনের কাজে আমি ওনাকে হেয় করব না সম্মান করব বুঝতে পারছি না। এরই মধ্যে ওদের সব লোকজন এখানে আসল ওরা সবাই আমাকে দেখে অবাক। ওরা মুরুব্বির দিকে জিজ্ঞাসাসূচক দৃষ্টিতে চাওয়া মাত্রই সে বলল ওকে তোমরা এইভাবে মারলে কেন ও তো তোমাদের কোন ক্ষতি করে নাই। তার কথা শুনে সবাই মাথা নিচু করে রাখছে। সবাই আমার দিকে চেয়ে বলল আমাদের ভুল হইছে আমাদের মাফ করে দাও। আমি একটু বিমূঢ় ভঙ্গিতে বললাম থাক মাফ চাইতে হবে না। তারপর মুরুব্বির দিকে তাকিয়ে বললাম আমাকে বাড়ি ফিরে যেতে হবে, বড়ির লোকজন অনেক চিন্তা করছে। তারপর মুরুব্বি কান্না মাখা মুখ নিয়ে বলল তাড়াতাড়ি ফিরে যাও তোমার বাবা মা এমন চিন্তা করতে আছেন যেমনটা আমি সোহাগীকে হারিয়ে করেছি। তাড়াতাড়ি যাও!
তারপর আমি ওখানের সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির পথে রওনা হলাম। কিছুদূর যাওয়ার পর পিছনের দিকে তাকিয়ে ডান হাত বিদায়ের ঈশারায় নাড়িয়ে আবার বিদায় নিয়ে আমার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে চলতে লাগলাম।
বি.দ্র. গল্পটি সম্পূর্ন কল্পলাহীনি। এর সাথে বাস্তবের কোন মিল নেই।
গল্প: সোহাগী
লেখক: জাহিদুল ইসলাম জিহাদ
সময়: ২০১৮